1. admin@dainikshatakantha.com : dainikshatakantha :
বুধবার, ২১ জুলাই ২০২১, ১০:১১ অপরাহ্ন

ঝালকাঠির ইকোপার্কে অস্থায়ী বসবাস, বেদে পরিবারে দু’সহোদর কুরআনের শিক্ষার্থী!

  • প্রকাশিত : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০
  • ২৯৫ বার পড়া হয়েছে
ঝালকাঠির ইকোপার্কে পিতার সাথে কুরআনের শিক্ষার্থী দু’সহোদর। মোঃ হুসাইন আহমেদ (বামে), মোঃ আশরাফ আলী (মাঝে) ও মোঃ হাসার আহমেদ (ডানে)

মোঃ আতিকুর রহমান
ঝালকাঠির সুগন্ধা, বিষখালী ও গাবখান নদীর মোহনায় প্রস্তাবিত ইকোপার্কে অস্থায়ীভাবে স্থান নিয়েছে অনেকগুলো বেদে পরিবার। কয়েকটি বহর নিয়ে এখানে তারা আশ্রয় নিয়েছেন। তারই একটি নৌবহরের সর্দার মোঃ আশরাফ আলী (৩৫)। ১৮ বছর বয়সে তিনি দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। ইতিমধ্যে তাদের সংসারে ৪ ছেলের জন্ম হয়। বড় ছেলে আশিক আহমেদ স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন, মেঝো ছেলে আতিকুল ইসলাম কুরআনের হাফেজ ও যাত্রাবাড়ি কওমী মাদ্রাসার ছাত্র। তৃতীয় ছেলে মোঃ হুসাইন আহমেদ (১৪) কুরআন দেখে শুদ্ধভাবে পড়া শিক্ষা (ক্বারিয়ানা) সম্পন্ন করে ৫ম পাড়ার ১৯পৃষ্ঠায় হেফজ পড়ছে। আর ছোট ছেলে হাসান আহমেদ (১২) কুরআন দেখে শুদ্ধভাবে (ক্বারিয়ানা) পড়ছে ২৭তম পাড়ায়।
বেদে বহরে কখনো ডাঙায় আবার কখনও পানিতে বসবাস করে পূর্ব পুরুষের ন্যায় তাদের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। সাধারণত বেদেরা নিরক্ষর হয়ে থাকে। সেখানে ৪ জন পুত্র সন্তানের মধ্যে ৩জনকে মাদ্রাসা শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে ব্যতিক্রমী দায়িত্ব পালন করছেন সরদার মোঃ আশরাফ আলী।
মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার গোয়ালিমন্ডার গ্রামে মোঃ মোসলেম আলী সরদারের পুত্র আশরাফ আলী। তিনিও বেদেদের একটি বহরের সরদার। বংশ পরম্পরায় বেদে হিসেবে যাযাবর থেকেই তারা জীবন যাপন করছেন।
আশরাফ আলী জানান, জন্ম থেকেই নৌকায় বসবাস করে মা-বাবার সাথে থেকেই এমনভাবে বেড়ে ওঠা। শিক্ষা অর্জন করা ভাগ্যে জোটেনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বেদের এক কন্যা ফরিদা বেগমের সাথে বিয়ে হয়। যেখানে আমাদের নৌ-বহর গিয়ে থামে সেখানের ডাঙায় স্থান নেই। ওই এলাকার ও পার্শ্ববর্তি গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি উপার্জন করেন, আর আমি স্থানীয় হাটবাজারে কড়ি, মালা, মাদুলি নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করি। ইতিমধ্যে আমাদের সংসারে প্রথম পুত্র হিসেবে আশিক আহমেদের জন্ম হয়। তার বয়স ৫ বছর হতে শুরু করলেই তাকে মুসলমান হিসেবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার উদ্যোগ নিলে আশিকের অনাগ্রহের কারণে আর সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে দুনিয়াতে আসে মোঃ আতিকুল ইসলাম। তাকে মাদ্রাসায় পড়িয়ে কুরআনের হাফেজ বানিয়েছি। সে এখন ঢাকা যাত্রাবাড়ি এলাকার একটি কওমী মাদ্রাসার ছাত্র। কয়েকবছর পরেই তৃতীয় পুত্র হুসাইন আহমেদের জন্ম হয়। এর দুই বছর পরে জন্ম হয় মোঃ হাসান আহমেদ’র। আমাদের সাথে থেকেই তারা বড় হতে শুরু করে। প্রত্যেককেই ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার বাইপাস মোড়ে বেলায়েত ক্বারীর মাদ্রাসায় কুরআন শিখতে ভর্তি করে দেই। সেখানে তারা কুরআনের শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে পার্শ্ববর্তি পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া কওমী মাদ্রাসায় কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করছে।
শিক্ষার খরচ বিষয়ে আশরাফ আলী জানান, আমরা গরীব মানুষ। সেভাবে খরচ দিয়ে চালাতে পারি না। যা পারি তা মাদ্রাসা প্রধানের কাছে দেই। বাকিটা তিনিই ব্যবস্থা করে চালিয়ে নেন।
কুরআন শিক্ষা দেয়ার উদ্যোগের বিষয়ে তিনি জানান, আমরা গরীব হলেওতো মুসলমান। পেশার দিক থেকে আমরা তেমন ধর্ম পালন করতে পারি না। তাই ছেলেদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতে শুরু করছি। মরার পরে যেন ওরা আমাদের জন্য দোয়া করতে পারে। ওরাই এখন আমার আশা-ভরসার স্থান বলেও মত ব্যক্ত করেন আশরাফ।
বসবাসের বিষয়ে আশরাফ আলী আরো জানান, আমরা এখন যেখানে যাই সেখানেই দুটি তাবু তৈরী করি। একটি আমরা এবং অপরটিতে সন্তানদের ঘুমাতে দেই।
হুসাইন আহমেদ জানায়, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে কুরআন শেখা শুরু হয়। রাজাপুর দারুল উলুম কওমী (বেলায়েত ক্বারীর মাদ্রাসা নামে খ্যাত) মাদ্রাসায় প্রথম ছবক নেই। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে কুরআন দেখে শুদ্ধভাবে পড়া শিক্ষা (ক্বারিয়ানা) সম্পন্ন করে ১ ডিসেম্বর কুরআন মুখস্ত করে (হিফজ) পড়া শুরু হয়। এরপর ভান্ডারিয়া ধাওয়া কওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হলে সেখানে বর্তমানে ৫ম পাড়ার ১৯পৃষ্ঠায় হেফজ পড়তেছি। গত রমজানে বরগুনা জেলার বামনা লঞ্চঘাট সাহেবের বাড়ি জামে মসজিদে তারাবির নামাজ পড়িয়েছে বলেও জানায় হুসাইন।
হাসান আহমেদ জানায়, বড় ভাইয়ের সাথী হিসেবেই সে যেখানে গিয়ে পড়ে আমিও তার সাথে সাথে থাকি। রাজাপুর দারুল উলুম কওমী মাদ্রাসায় প্রথম ছবক নেই। বর্তমানে ভান্ডারিয়া ধাওয়া কওমী মাদ্রাসায় কুরআন দেখে শুদ্ধভাবে (ক্বারিয়ানা) ২৭তম পাড়ায় পড়তেছে হাসান।
কুরআনের শিক্ষার্থী হিসেবে সন্তোষ প্রকাশ করে তারা দুসহোদর জানায়, আমাদের সবাই স্নেহ করে ও ভালোবাসে। ইকোপার্ক সংলগ্ন কিফাইতনগর (পুরাতন ফেরীঘাট) জামে মসজিদে জামায়াতের সাথে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। মাঝে মধ্যে ইমাম সাহেব অনুপস্থিত থাকলে এলাকার লোকজন আমাদের নামাজ পড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন। আমরাও তাঁদের অনুরোধে দায়িত্ব পালন করি।
মুসল্লি আঃ লতিফ সিকদার জানান, কিছুদিন পূর্বে অনিবার্যকারণবশতৎ মসজিদের ইমাম সাহেব নামাজের সময় উপস্থিত হতে পারেননি। এসময় বেদে বসতি থেকে দুটো ছেলে আসছিলো নামাজ পড়তে। তাদের নামাজ পড়ানোর জন্য বললে ইমাম হিসেবে তারা খুব সুন্দর করেই আমাদের নামাজ পড়িয়েছেন। শুধু একদিন না, কয়েকদিনই এভাবে তাদের দিয়ে আমরা নামাজ পড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
সর্বস্বত্ত্ব © দৈনিক শতকন্ঠ - ২০২১ কর্তৃক সংরক্ষিত।
Theme Customized By BreakingNews