নারিকেল সুপারি গাছ বেয়ে ৩২ বছর সংসার চালাচ্ছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কুদ্দুস মোল্লা!

0
167
নারিকেল গাছে উঠছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী
ঝালকাঠির কিফাইতনগর এলাকার একটি নারিকেল গাছে উঠছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আবদুল কুদ্দুস মোল্লা।

কে এম সবুজ
প্রতিবন্ধী মানেই প্রতিভা বন্দি নয়, তারই জলন্ত উদাহরণ ঝালকাঠির কিফাইত নগর এলাকার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কুদ্দুস মোল্লা (৫২)। অন্ধ হয়েও ৩২ বছর ধরে নারিকেল ও সুপারি গাছ বেয়ে মা হারা তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। একটি ভাঙাচোড়া খুপড়ি ঘরে কোন রকমের দিন কাটছে তাঁর। তবু অন্যের সাহায্যের অপেক্ষা করেন না। প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি, দক্ষতা ও দৃঢ় মনবলের কারণে মধ্য বয়সী এ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হাল ছাড়েননি কখনো। পৃথিবীর সুন্দর রূপ দেখতে না পারলেও নিজের তিন মেয়েকে সুন্দর পৃথিবী দেখানোর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
জানা যায়, ১১ বছর বয়সে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে দুচোখের দৃষ্টি হারান দরিদ্র পরিবারের এই সন্তান। এ অবস্থায় দিনমজুরি শুরু করলেও তা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। ২০ বছর বয়স থেকে শুরু করেন নারিকেল ও সুপারি গাছে ওঠার কাজ। কখনো অন্যের গাছের নারিকেল পেড়ে, আবার নারিকেল গাছ পরিস্কার করাই হয়ে ওঠে তাঁর পেশা। মাঝে মধ্যে সুপারি পেড়ে দিয়েও কিছু আয় হয় কুদ্দুস মোল্লার। অন্ধ হয়েও নারিকেল এবং সুপারি গাছ বেয়ে ওঠায় পারদর্শী তিনি। সুস্থ একজন মানুষের চেয়ে তিনি দ্রুত গতিতে গাছে উঠতে ও নামতে পারেন। একটি নারিকেল গাছে ওঠার জন্য তিনি ৫০ থেকে ১০০ টাকা রোজগার করেন। কেউ আবার গাছপ্রতি দুই-তিনটি নারিকেল দেন। এগুলো বিক্রি করেই চলে তাঁর সংসার।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কুদ্দুস মোল্লা জানান, ২২/২৩ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে কোন রকমের দিন কেটে যেতো। দশ বছর আগে স্ত্রী মারা গেলে সঙ্গীহীন হয়ে পড়েন। এরপরই তিন মেয়েকে নিয়ে কিছুটা বিপাকে পড়েন কুদ্দুস মোল্লা। তারপরও দারিদ্র এবং অন্ধত্বের কাছে হার মানেননি তিনি। মায়ের মমতা দিয়ে লালন পালন করেন তিন মেয়েকে। বছর তিনেক আগে বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এখন দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। অর্থের অভাবে কোন মেয়েকেই লেখা পড়া করাতে পারেননি। এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট।
কুদ্দুস মোল্লার দুঃসাহসিক জীবন সংগ্রামের কারণে এলকার মানুষও তাকে নিয়ে গর্ব করে। কারণ তিনি কষ্ট করে সংসার চালালেও অন্যের কাছে হাত পাতেননি।
কুদ্দুস মোল্লা বলেন, মানুষের কাছে হাত পেতে লজ্জায় পড়তে হয়। আমি চোখে দেখি না, তাই বলে কোন কাজ করতে পারবো না! আমার শক্তি আছে, মনবল আছে। আমি ভিক্ষা পছন্দ করি না, তাই চোখে না দেখেও নারিকেল ও সুপারি গাছে উঠে ফল পারতে পারি। আমার ছোট মেয়ে আমাকে গাছের কাছে নিয়ে ধরিয়ে দেয়। এর পরে আমি নিজেই ওঠে যাই। নারিকেল পেড়ে দেওয়ার জন্য গাছপ্রতি কেউ ১০০, কেউ একটু বেশি দেয়। অনেকে আবার একজোড়া নারিকেল দেয়। যে যায় দেয়, তাতেই আমি খুশি। বর্তমানে আমি খুব অসহায় অবস্থায় আছি। বৃষ্টির মধ্যে কেউ গাছে ওঠাতে চায় না। যদি পড়ে গিয়ে মরে যাই। শেষ বয়সে আমার ইচ্ছা, দুই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া, আর নিজের জন্য একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করা। প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে কোন সাহায্য করতেন, আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকতাম।
কুদ্দুস মোল্লার প্রতিবেশী মো. রাজু খান বলেন, আমাদের আশেপাশে যতগুলো বাড়ি আছে, সবারই নারিকেল ও সুপারি গাছ থেকে ফল পেড়ে দেন কুদ্দুস ভাই। তিনি অন্ধ হয়েও যথেষ্ট পরিশ্রমি। কখনো তাকে ভিক্ষা বা অন্যের কাছে হাত পাততে দেখিনি। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি।
ঝালকাঠি পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব লিয়াকত আলী তালুকদার বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আবদুল কুদ্দুস মোল্লার সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর নেওয়া ও প্রতিবন্ধী কার্ড করতে সহযোগিতা করেছি। তিনি খুব ভালো মানুষ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here