1. admin@dainikshatakantha.com : dainikshatakantha :
মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন

করোনাভাইরাস : ঝালকাঠির ৩শ পাটিকর পরিবারের দৈন্যদশা

  • প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২০
  • ৫৪৪ বার পড়া হয়েছে
বুনন পাটি

মোঃ আতিকুর রহমান
‘চন্দনেরি গন্ধভরা, শীতল করা, ক্লান্তি–হরা, যেখানে তার অঙ্গ রাখি, সেখানটিতেই শীতল পাটি’। ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘খাঁটি সোনা’ কবিতায় বাংলার মাটিকে এভাবে শীতলপাটির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের শীতলপাটিকে বিশ্বের নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু যাঁরা এই শীতলপাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত, বাংলার সেই পাটিকরদের এখন চরম দুর্দশা। করোনার কষাঘাতে ঝালকাঠির ৩শতাধিক পাটিকর পরিবারের আগের মতো সচ্ছলতা নেই। আগের মতো বিক্রিবাটা নেই বলে তাঁদের বেশির ভাগই আর্থিক অনটনে রয়েছেন। ঝালকাঠিতে লকডাউন করার ফলে পাটি তৈরী করে রাখলেও ভরা মৌসুমে কেউ এখন পাটি কিনছেন না। তারপরও তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্যবাহী পেশায় টিকে থাকতে।
শীতলপাটি ঝালকাঠি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য। একটা সময় গরমের দিনে মানুষকে অনাবিল শ্রান্তি এনে দিতে শীতলপাটির কোনো জুড়ি ছিল না। মোর্তা বা পাটিবেত বা মোস্তাক নামক গুল্ম–জাতীয় উদ্ভিদের ছাল দিয়ে তৈরি করা হয় এই পাটি। কোথাও কোথাও এই পাটিকে নকশিপাটি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এই নিপুণ হস্তশিল্প শহর-গ্রামে মাদুর ও চাদরের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। দেশের উর্ধ্বতন কোন নীতি নির্ধারক বা কর্মকর্তা এবং বিদেশী কোন অতিথি আসলে জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য হিসেবে শীতলপাটি তাঁদের উপহার দেয়া হয়। হাতে বুনানো শীতল পাটির কদর সবার কাছেই। শীতলপাটি বুনিয়ে ৩শতাধিক পরিবারের হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন হয়ে ওঠে।
ঝালকাঠির সচেতন মহলের দাবী, সরকারের উচিত এই শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রণোদনা দেওয়া। পাটি বিক্রির মৌসুমে পাটিকরদের জন্য বিনা সুদে ঋণের কোনো ব্যবস্থা নেই, বা তাঁদের পুনর্বাসনও করা হয় না। সরকারকে এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
জানাগেছে, রাজাপুর উপজেলার পাটিগ্রাম নামে পরিচিত হাইলাকাঠি। এ গ্রামসহ আশপাশের ক’টি গ্রামে ২শতাধিক পরিবার পাটি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে। বর্তমানে বিক্রির মৌসুম হওয়া সত্বেও করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তৈরিকৃত শীতলপাটি বিক্রী করতে পারছেন না পাটিকররা। বছরে ফাল্গুন মাস হতে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত গরমকাল হওয়ায় পাটির চাহিদা বেশি থাকে । কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে শীতলপাটি বেচা-কেনা বন্ধ রয়েছে । করোনাভাইরাসের ভয়ে খুচরা ও পাইকাররা আসতে পারছে না পাটি কিনতে । তাই বাজার প্রায় শূন্যের কোঠায়। ঝালকাঠি জেলার গন্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সমাদৃত এখানকার তৈরিকৃত শীতলপাটি । বংশ পরম্পরায় চলে আসায় পাটিকর কারিগরা অন্য পেশায় যেতে পারছেন না। তাঁদের একমাত্র আয়ের উৎস হচ্ছে পাটি তৈরি করে বিক্রি করা। এ দিয়ে যা আয় হয় কোন মতে সংসার চালায় এবং বাচ্চাদের লেখা-পড়ার পিছনে খরচ করে থাকে সেই অর্থ। বাজারে এ দুরাবস্থার কারণে পাটিকর পরিবারগুলো দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন কিভাবে সংসার চালাবে তারা ?
এমনিতেই বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি পাটি বাজারে সয়লাভ হওয়ায় গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বাজার হারিয়ে ফেলছে। দিন দিন বাজার থেকে হারিয়ে যেতে বসছে শীতলপাটির চাহিদা। তপন ও বিজয় পাটিকর বলেন, সরকারি সহযোগিতায় অল্প সুদে ঋণ পেলে এবং সরকার বাজারজাত করণের উদ্যোগ গ্রহণ করলে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটির বাজার আবার ফিরে পাওয়া যাবে ।
মঠবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সিকদার বলেন, শীতল পাটির আগেরমত বাজারে চাহিদা না থাকায় পাটিকররা এমনিতেই মানবেতর জীবন যাপন করছে । করোনাভাইরাসের কারণে তারা আরো ক্ষতির মধ্যে পড়বে। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতদুর সম্ভব তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।
পাটিকরদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, জেলার রাজাপুরের হাইলাকাঠি গ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে ৯০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ৮-১০ বছরের শিশুরাও নিপুণ কারুকাজে পাটি তৈরী করে থাকে। এখানকার চিকনবেতির শীতলপাটির চাহিদাও প্রচুর। এ অঞ্চলে অতিথিদের সামনে একটি ভালো মানের শীতলপাটি বিছিয়ে নিজেদের আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়। পাটি শিল্প তাই বাংলাদেশের লোকাচারে জীবনঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক উপাদান।
গরমের মৌসুমে এসব পাটি তাপে খুব বেশি গরম হয় না বলে একে শীতলপাটি বলা হয়। পাইত্রা বা মোর্তা নামে এক ধরনের বর্ষজীবী উদ্ভিদের কান্ড থেকে বেতি তৈরি করা হয়। পরিপক্ক পাটি গাছ কেটে পানিতে ভিজিয়ে তারপর পাটির বেতি তোলা হয়। এরপর ভাতের মাড় ও পানি মিশিয়ে বেতি জ্বাল দেওয়া হয়। এর ফলে বেতি হয়ে ওঠে মসৃণ ও সাদাটে। বেতির উপরের খোলস থেকে শীতলপাটি, পরের অংশ তুলে বুকার পাটি এবং অবশিষ্ট অংশ ছোটার (চিকন দড়ি) কাজে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ঝালকাঠি জেলায় তিনশ’র বেশি পরিবার এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামে রয়েছে দুই শতাধিক পরিবার। এরা সবাই পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরাতন ঐতিহ্যের কারু হাতে গড়া শীতল পাটির জন্য এ গ্রাম দু’টিকে ‘শীতল পাটির’ গ্রামও বলা হয়। এ গ্রামের শত শত হেক্টর জমিজুড়ে রয়েছে বিশাল নজরকাড়া পাটিগাছের বাগান। এখানে শীতলপাটি, নামাজের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরনের পাটি তৈরি করা হয়। পাটির বুনন পদ্ধতি প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমত, পাটির জমিনে ‘জো’ তুলে তাতে রঙিন বেতি দিয়ে নকশা তোলে। দ্বিতীয়ত, পাটির জমিন তৈরি হলে তার চতুর্দিকে অন্য রঙের বেতি দিয়ে মুড়ে দেয়। পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাটিকরদের পেশা এগিয়ে চলছে। শৈল্পিক উপস্থাপনায় এবং নির্মাণ কুশলতার কারণে দক্ষ ও সুনিপুণ একজন পাটিয়াল নারীর কদরও রয়েছে সর্বত্র। একটি পাটি বুনতে ৩-৪ জনের দুই-তিন দিন সময় লাগে। যা বিক্রি করে পাঁচশ’ থেকে দেড় হাজার টাকা আসে। মহাজনরা প্রতি পাটিতে একশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকা লাভ করেন। পাইত্রা চাষ ও কেনার জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন হয়। এজন্য শিল্পীরা মহাজন ও এনজিওর কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। এ শিল্পের সাথে জড়িতদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় পুঁজির জন্য শিল্পীরা দাদন ব্যবসায়ী, সুদখোর মহাজনদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। তাছাড়া বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্তেও এখন পর্যন্ত শীতলপাটি রফতানিযোগ্য পণ্যের স্বীকৃতি পায়নি।

শীতলপাটি বুননের দৃশ্য

মঞ্জুরানী পাটিকর বলেন, ‘আমাদের শীতলপাটি দেশ-বিদেশের বিভিন্নস্থানে মেলা কিংবা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের অন্যকোন উপার্জন নেই। শুধু শীতলপাটি বিক্রি করেই সংসারের খরচ এবং ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালাই। শীত এবং বর্ষায় আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়। সরকার বিনাসুদে ঋণ দিলে বেশি পাইত্রা কিনে শীতলপাটি তৈরি করা যেত।’
১০ম শ্রেণির ছাত্রী মৌসুমি জানায়, তাদের পরিবারের সবাই পাটি বুনতে পারে। বাবা-মাকে সহযোগিতা করার জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি পাটি তৈরি করেন। এতে বাবা-মাও তার প্রতি খুশি।
পাটি শিল্পী সমিতির সভাপতি বলাই চন্দ্র পাটিকর বলেন, ‘সরকার হাইলাকাঠি গ্রামের পাটি শিল্পীদের সরকারিভাবে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই খাতের আওতায় ঋণ দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ জন পাটি শিল্পীকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছিলেন। তবে বিনাসুদে ঋণ দিলে আমরা উপকৃত হবো।’
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ‘চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পাটি বিপণন সমস্যা থাকায় বছরের একটি সময় তাদের বসে থাকতে হচ্ছে। আমরা সরকারের অতিদরিদ্র্য কর্মসৃজন কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র্ পাটি শিল্পীদের কাজের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। হয়তো এটি অচিরেই সম্ভব হবে।’ করোনার কারণে পাটিকরদের পাটি বিক্রি বন্ধ থাকায় তাদের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
সর্বস্বত্ত্ব © দৈনিক শতকন্ঠ - ২০২১ কর্তৃক সংরক্ষিত।
Theme Customized By BreakingNews