1. admin@dainikshatakantha.com : dainikshatakantha :
রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ০৩:২৩ অপরাহ্ন

ঝালকাঠির বোরো চাষিরা বাম্পার ফলনেও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত

  • প্রকাশিত : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২০
  • ২৪৮ বার পড়া হয়েছে
ঝালকাঠির বোরো চাষিরা বাম্পার ফলনেও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ।

মোঃ আতিকুর রহমান
ঝালকাঠি জেলার ৪ উপজেলায় কৃষি অধিদপ্তরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৭৫ হেক্টর অতিরিক্ত জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। চাষীদের বোরো আবাদে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবুও কৃষকের মুখে হাসির পরিবর্তে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ধানের দাম কম থাকায় এলাকার হাজার হাজার কৃষকের চোখে মুখে হতাশার ছাপ দেখা দিয়েছে। এলাকার অসহায় দরিদ্র কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অনুকুল আবহাওয়ার কারণে এবার সারা দেশের মতো ঝালকাঠিতে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। যেন এই বাম্পার ফলন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক, আগাছা দমন, মাড়াইসহ প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয় দাম কম হওয়াতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করে কৃষক ফসল ফলান; কিন্তু কৃষক তার ন্যায্য দাম পান না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এ বছর ২৭৫ হেক্টরে আবাদ সম্প্রসারণ বেশি হয়েছে। এছাড়া বোরো চাষাবাদকালীন সময়ে ধানক্ষেতে কোনো ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণ হয়নি। উচ্চ ফলনশীল জাত থেকে হেক্টর প্রতি ৫-৬ মেট্রিক টন এবং সুপার হাইব্রিড থেকে ১০-১২ মেট্রিন টন ধানের ফলন পাওয়া গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, ঝালকাঠি জেলায় ৯,৫৭৫ হেক্টরে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ৯,৮৫০ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের মধ্যে সুপার হাইব্রিড এস এল-৮ জাত এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের মধ্যে ব্রি-২৮-২৯, ব্রি-৪৭ বিনা-১০ সিংহ ভাগ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৯,৫৫০ হেক্টরে উচ্চ ফলনশীল এবং ২৯০ হেক্টরে হাইব্রিড ও ১০ হেক্টরে স্থানীয় জাতের আবাদ হয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ধানের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
জানাগেছে, প্রতি বছর স্থানীয় একশ্রেণির অসাধু, অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও দালালচক্র কৃষকদের এই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পরিবেশ অনুক‚লে থাকায় সাধারণ কৃষকরা ধান চাষ করে একটু লাভের আশা করেছিলেন; কিন্তু ধান কাটা শুরু হতেই তারা আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছেন। ধানের দরপতনের ফলে প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা পড়েছেন মহাবিপদে। ধান চাষের আগে এলাকার অধিকাংশ কৃষক চড়া সুদে এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। চলতি মৌসুমে ধান কাটার শুরুতেই ঋণের টাকার চাপ, শ্রমিকের মজুরি পরিশোধের চাপে বোরো ধান ক্ষেত থেকেই পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
করোনাভাইরাসের কারণে শ্রমিকসঙ্কটের কারণে অনেকেই ধান কাটতে পারছেন না। একজন শ্রমিককে প্রতিদিন তিনবেলা খাবারসহ সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি দিতে হয়। কৃষকের শুধু ধান কাটতেই খরচ হয় প্রায় ৮০০ টাকা। অন্যান্য খরচ তো আছেই। ফলে ধানের দাম কম থাকায় ধান বিক্রি করে তাঁদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। তার ওপর ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচসহ সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
উপজেলার রমনাথপুর গ্রামের মুন্নাফ মিয়া, ঠান্ডু, নজু মোল্লাসহ অনেক কৃষক জানান, প্রতি বিঘায় ২৫-৩০ মণ ধান পেয়েছেন; কিন্তু ধানের দাম না থাকায় আসল টাকা ওঠাতো দূরের কথা, এবার অনেক টাকা লোকসান হবে।
কৃষক কবির খান জানান, ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তিনি প্রায় দুই বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। কীটনাশক, সেচ, হাল দেয়া, আগাছা দমন, ধান মাড়াই ও কাটাসহ প্রতি মণ ধানে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রতি মণ বোরো ধান ঘিওর হাটে বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায়। কাজেই এবার ধানে কোন লাভ হবে না। একই গ্রামের কৃষক সাকাওয়াত জানান, চার বিঘা জমি ভাড়া করে বোরো আবাদ করেছি। প্রতি মণ ধান উৎপাদন করতে আমার খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬০০ টাকা। বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৫০০ টাকা।
ধান কাটা শ্রমিক বকুল, শাজাহান, রফিক জানান, প্রতিদিন ৬০০ টাকা রোজ হিসাবে তারা বোরো ধান কাটছেন। এরপর তিনবেলা খাবারসহ সব খরচ জমির মালিক দেন।
এলাকার সাধারণ কৃষকদের প্রাণের দাবি, দালাল, ফড়িয়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান না কিনে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হলে সরকারের মহৎ উদ্যোগ শুদ্ধ ও সুন্দর হবে।
সদর উপজেলার কৃষক দুলাল হাওলাদার বলেন, ‘আমি কম দাম দেখে আমার ধান বিক্রি করিনি। দাম বেড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করবো।’
প্রায় ৪০ শতাংশ ধান কাটার আগেই কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধানের দাম মন প্রতি ৭০০ – ৮০০ টাকা না হলে সকল পরিশ্রমই বৃথা যাবে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কৃষকরা। তাদের দাবি, প্রতি মণ ধানের দাম ৭০০-৮০০ টাকায় বাড়াতে হবে।
এদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ফল কাটার পরবর্তী মাঠ দিবস করতে গিয়ে ধানের দাম না থাকায় কৃষকদের রোষাণলে পড়েছেন। কৃষকরা তাদের জানিয়েছেন, ধানের দাম না বাড়লে তারা কোনো ধরনের ধানের আবাদ করবে না।
নলছিটি উপজেলার প্রেমহার গ্রামের বাম্পার ফলন উৎপাদনকারী কৃষক ইউনুচ মাঝি বলেন, লাভ না হলে তার পক্ষে বোরো ধানের চাষ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ফজলুল হক জানান, কৃষকরা যাতে ন্যায্য মূল্য পান তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
সর্বস্বত্ত্ব © দৈনিক শতকন্ঠ - ২০২১ কর্তৃক সংরক্ষিত।
Theme Customized By BreakingNews