1. admin@dainikshatakantha.com : dainikshatakantha :
রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০২:১৮ অপরাহ্ন

ঝালকাঠিতে বৈচিত্র পেশায় সংগ্রামী সবিতা রানি দাস

  • প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২০
  • ৩৩৯ বার পড়া হয়েছে
ঝালকাঠির বাউকাঠিতে বৈচিত্র পেশার কারিগর সবিতা রানি দাস।

মোঃ আতিকুর রহমান
‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম’র উক্তিটি আমাদের সমাজের অনেকাংশেই বাস্তব। সমাজে নারী এবং পুরুষের সমান অংশ গ্রহণে পরিবার সমাজ রাষ্ট্র এবং বিশ্ব এগিয়ে চলছে। কিন্তু তারপরেও সমাজে এমন কিছু বৈচিত্রময় পেশা আছে যে পেশাটা নারীর জন্য একটু বিস্ময়কর, একটু বিচিত্র। এমনই এক বিচিত্র পেশার নারী ঝালকাঠির সবিতা রানি দাস। যিনি ফুটপাতে বসে অন্যের জুতা স্যান্ডেল মেরামত করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার ৩নং নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি শতাধিক বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী বাউকাঠি বাজারে। ঝালকাঠি শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরেই নবগ্রাম ইউপি ভবনের সামনে ফুটপাতে বসে জুতা মেরামতের কাজ করে সবিতা রানি দাস। বর্ষা মৌসূমে ইউপি ভবনের সামনের বারান্দার এক কোণে বসে এ কাজ করতে হয়। ৯ বছর ধরে এখানের ফুটপাতে বসেই তিনি পৈত্রিক পেশা জুতা মেরামতের কাজ করছেন।
সবিতা রানি দাস অগোছালো কথায় জানান, “ছোট বেলায় মা-বাবা মারা গেছেন। বাবা জুতা সেলাই করেই আয় করে আমাদের খাওয়াতেন। ছোটবেলায় পিতার কাছে বসে জুতা সেলাই দেখেছি। এজন্য পিতার কাছ থেকে শেখা মুচির কাজ করে খেতে হচ্ছে। বাবা-মা মারা যাবার পরে ছায়া দেয়ার মতো কেউ ছিলো না, লেখাপড়া করতে পারিনি। মা বাবা নাই , একাজ করেই খেতে হয়। জায়গা জমি অর্থ সম্পদ কিছু নাই, এ কাজ না করলে খাবার জোগারের আর কোন পথ নেই। ছোটবেলায় মা বাবা মারা গেছেন তাই লেখাপড়ার করার মতো সুযোগ হয়নি। ছায়া দেয়ার মতো কেউ নেই। আর এ কাজটা হলো আমার বাপ-দাদার পেশা। কোন লোক আমাকে নিন্দা করে না, কারণ আমি তো ১০জনের কাজ করে খাই। চুরি করলে, অশালীন-অসামাজিক কাজ করলে জাইত (ইজ্জত) যাবে কিন্তু কাজ করলে তো জাইত যাবে না। আমার কাজ দেখে সবাই খুশি, কারণ ভিক্ষা না করে কর্ম করে খাচ্ছি। মাঝে মাঝে কিছু কাজ হয় আবার হয় না। আবার মনে করেন যে, সিজনে (মৌসূমে) কাজটা হয় আবার অসিজনে কাজটা হয় না। বর্ষার সিজনে যখন ফুটপাতে বসে কাজ করি তখন এদিক ওদিক থেকে পানি আসে। পানি কাছাইয়া কুড়াইয়া কাজ করতে হয়। আমি চাইছিলাম যে পুরান একটা আমার সাথে থাকবে। সেই সাথে কিছু বেইচ্চা কিন্যা (বেচা-বিক্রি করে) একটা দোকান দেয়ার স্বপ্ন ছিলো, সামনে একটু আগানোর আশা ছিলো। এখানের দশজনে আমারে চায়। একবেলা এখানে না বসে পরে আসলে তখন সবাই আমারে না আসার কারণ জিজ্ঞাস করে, সবাই আমারে খোজে, যেহেতু আমি একজন দোকানদার।”
সবিতা আরো জানান, “করোনা দুর্যোগের সময় ঝুঁকি নিয়ে মুখে মাস্ক দিয়ে কাজ করছি। কিন্তু মানুষজন ঘরের বাইরে কম বের হচ্ছেন তাই এখন আয়ও কম হচ্ছে। এছাড়া আমাকে কেউ কোন সহায়তাও দেয়নি।”
সমাজ কর্মী পলাশ রায় জানান, নির্দিষ্ট কোন দোকান না থাকায় রোদ বৃষ্টি ঝড়ে আজ এখানে কাল ওখানে কাজ করে ফুটপাতেই কাটে সবিতার জীবন জীবিকা। তবুও এ সংগ্রামী নারী বাপ-দাদার পেশা হারাতে চান না। যতোই সংগ্রাম, কষ্ট আর বিচিত্রা হোক এ পেশাতেই জীবন কাটাতে চান। এ পেশায় টিকে থাকতে তিনি চাইছেন একটি ঘর, যেখানে বসে তিনি তার জীবন জীবিকা চালাতে পারেন। যেখানে পুরাতন জুতা স্যান্ডেল মেরামতের পাশাপাশি নতুন কিছু জুতা-স্যান্ডেলও বিক্রি করতে পারবেন তিনি। এজন্য তাঁর প্রয়োজন পুজির। সীমাহীন দারিদ্রের সংসারে এ নারীর সেই পুজি নেই। একটি ঘর ও সামান্য কিছু পুজি হলেই তিনি ঘুরে দাড়াতে চাইছেন। সবিতা একজন আত্ম সংগ্রামী নারী।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুল হক আকন্দ জানান, সবিতা রানি দাস মহিলা হয়েও জুতা মেরামতের কারিগর হিসেবে পুরুষের মতোই কাজ করছেন। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাকে ভিজিডি সহায়তা দিচ্ছি। এছাড়াও তার পেশাকে উন্নতি করতে পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান ইউপি চেয়ারম্যান।
ঝালকাঠি জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা (উপ-পরিচালক) মোঃ আলতাফ হোসেন জানান, সবিতা রানি দাস একজন আদর্শবান সংগ্রামী নারী। জয়িতার তালিকায় তাকে অন্তর্ভূক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ইউপি থেকে তাকে ভিজিডি সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
সর্বস্বত্ত্ব © দৈনিক শতকন্ঠ - ২০২১ কর্তৃক সংরক্ষিত।
Theme Customized By BreakingNews