1. admin@dainikshatakantha.com : dainikshatakantha :
মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ১১:৩৬ অপরাহ্ন

শ্রদ্ধায় স্মরণ করে বিচার বিভাগ, ভোলেনি স্থানীয় জনসাধারনও, ঝালকাঠিতে দু’বিচারক হত্যা দিবস আজ

  • প্রকাশিত : শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২০
  • ২৪৩ বার পড়া হয়েছে
নিহত বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে, সোহেল আহমেদ
নিহত বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে, সোহেল আহমেদ

মো. আতিকুর রহমান
ঝালকাঠিতে দু’বিচারক হত্যা দিবস আজ। ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর শীতের স্নিগ্ধ সকালে জমিয়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র আত্মঘাতি সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন বিচারকদের বহন করা গাড়িকে লক্ষ্য করে শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান বিচারক সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহম্মেদ এবং গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয় বিচারক সিনিয়র সহকারীর জজ জগন্নাথ পাঁড়ের। এ সময় তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি বিধ্বস্ত হয়।
দুর্ঘটনার স্থানে ইট, বালু ও সিমেন্টের তৈরি দাড়িয়ে থাকা স্মৃতি স্তম্ভে টাইলসের উপর নিহতদের অঙ্কিত ছবি ও নিহত দু’বিচারক স্মরণে বিচারক মাসুদুর রহমান’র এর লেখা ৪ লাইনের একটি কবিতা রয়েছে। আর স্মৃতি স্তম্ভ সুরক্ষায় এসএস পাইপ দিয়ে আটকিয়ে ফলক নির্মাণ করা হয়েছে। ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্ত¡রে গøাস দিয়ে আটকিয়ে নিপুন শৈলীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে বিধস্ত গাড়িটিও। প্রতিবছর এদিনটি (১৪নভেম্বর) স্মরণীয় করে রেখে স্মৃতি ফলকে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া-মোনাজাত করে ঝালকাঠির বিচার বিভাগ।
প্রতিবছরের ন্যায় শনিবার (আজ) সকাল ৯টায় জেলা ও দায়রা জজ মো. শহিদুল্লাহ’র নেতৃত্বে বিচারকগণ, আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সম্পাদক, জিপিসহ মোট ৩০জন নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে স্মৃতি ফলকে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।
২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর দিনটি ছিল সোমবার। সকাল ৮ টার দিকে আমার দোকানে এসে এক লোক রুটি কলা খেয়ে ঝালকাঠিতে থাকার হোটেল আছে কিনা জানতে চায়। শহরের মধ্যে হোটেল আছে বলে তাকে জানানো হয়। কিছুক্ষণ পরে সকাল ৯ টার দিকে বিকট একটি শব্দ হয়। দোকানের সাজানো মালামাল পড়ে এলোমেলো হয়ে যায়। মাংস পোড়া গন্ধ আসতে শুরু করে। কাকগুলো মাংস পোড়া গন্ধ পেয়ে ডাকাডাকি করতে থাকে। চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। দৌড়ে গিয়ে দেখি বিধ্বস্ত গাড়ি, ৩ জন লোক গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছে। তাদেরকে উদ্ধার করলে ঘটনাস্থলেই ক্ষতবিক্ষত ১জনকে মৃতাবস্থায় পাওয়া যায়। বাকি ২ জনকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। তখন চিনতে পারি এদের মধ্যে ২ জন ঝালকাঠির বিচারক এবং অপরজন আমার দোকান থেকে রুটি কলা ক্রেতা ঘাতক মামুন। কথাগুলো বললেন প্রত্যক্ষদর্শী পূর্ব চাঁদকাঠি এবাদুল্লাহ জামে মসজিদ সংলগ্ন ব্যবসায়ী ও কলেজ ছাত্র জোবায়ের হোসেন। বর্তমানে সে ঝালকাঠি শহর ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি আরো জানান, জেএমবির বোমা বিস্ফোরিত স্থানে স্মৃতি চিহ্ন রক্ষার্থে নাম ফলক বা ভিত্তি ফলক স্থাপন করা হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ১৪ নভেম্বর সকাল ৯ টার দিকে সরকারি বাসা থেকে ঝালকাঠি আদালতের সহকারী বিচারক সোহেল আহমেদ ও জগন্নাথ পাড়ে কর্মস্থলে যাবার পথে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাস অপর বিচারক আউয়াল হোসেনের বাসার সামনে অপেক্ষা করতে থাকে। এসময় জেএমবি সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন তাদেরকে একটি লিফলেট পরতে দিলে তারা বিব্রতবোধ করে ফিরিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে মামুন তাদেরকে লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়লে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা ঝালকাঠি শহর। ঘটনাস্থলেই মারা যান বিচারক সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহম্মেদ এবং গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয় বিচারক সিনিয়র সহকারীর জজ জগন্নাথ পাঁড়ের। এ সময় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি বিধ্বস্ত হয়। আহত অবস্থায় ধরা পড়ে হামলাকারী, জেএমবি সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন। সারাদেশের মানুষ এ ঘটনায় হতবাক হয়ে যান। এরপর পর্যায়ক্রমে জেএমবির শীর্ষ নেতারা আটক হয়। জঙ্গিদের ঝালকাঠিতে এনে তাদের উপস্থিতিতে জেলা জজ আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারকার্য চলে। তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজা তারিক আহমেদ ২০০৬ সালের ২৯ মে এজাহারভুক্ত আসামি সুলতানকে বাদ দিয়ে ৭ জনকে ফাঁসির আদেশ দেন। উচ্চ আদালতে সে রায় বহালের পর দেশের বিভিন্ন জেলখানায় ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ ৬ শীর্ষ জঙ্গির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। এরা হলেন- জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, সামরিক শাখা প্রধান আতাউর রহমান সানি, উত্তরাঞ্চলীয় সমন্বয়কারী আবদুল আউয়াল, দক্ষিণাঞ্চলীয় সমন্বয়কারী খালেদ সাইফুল্ল¬াহ ও বোমা হামলাকারী ইফতেখার হাসান আল মামুন। সর্বশেষ অন্য সাজাপ্রাপ্ত আসাদুল ইসলাম আরিফের ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাতে খুলনার কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। ২৯ মার্চ শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার ২০ দিন পর মামলা পরিচালনাকারী তৎকালীন সরকারি কৌসুঁলী হায়দার হোসেনকে ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল এশার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরক্ষণেই মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঝালকাঠির আদালতে খুনিদের ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছে সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট।
ঝালকাঠি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান রসুল জানান, নিহত বিচারকদ্বয়ের স্মরণে তাদের নামে জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের হলরুমটির নামকরণ করা হয়। তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় শনিবার (আজ) সকাল ৯টায় ঘটনাস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া-মোনাজাত। বিকেলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সোহেল আহম্মেদ ও জগন্নাথ পাঁড়ে হলরুমে দোয়া ও শোক সভার আয়োজন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ঝালকাঠির পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব লিয়াকত আলী তালুকদার গাড়িটি সংরক্ষণে মিউজিয়াম নির্মাণের ইচ্ছা পোষণ করলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মিউজিয়াম নির্মাণের অনুমতি চেয়ে জেলা জজের পক্ষে আবেদন করা হয়। মন্ত্রণালয় মিউজিয়াম নির্মাণের অনুমতি দিলে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কাজী মহসিন রেজা নকশা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করেন। দুর্ঘটনা কবলিত স্থানটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছে।
প্রয়াত জগন্নাথ পাড়ের শ্বশুর মুকুল চন্দ্র মুখার্জি মুঠোফোনে জানান, হত্যাকান্ডের স্মৃতি রক্ষার্থে বিধ্বস্ত গাড়িটি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ ও ঘটনাস্থলে স্মৃতিফলক নির্মাণ হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমার মেয়ে পল্লবী মুখার্জি পাড়ে (জগন্নাথ পাড়ের স্ত্রী) অল্পবয়সেই স্বামী হারা হয়েছেন। তাকে ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকে চাকরী দেয়া হয়েছে। বর্তমানে একমাত্র পুত্রের পড়াশোনা, নিজের কর্মস্থলে থাকায় সব মিলিয়ে অমানবিক কষ্ট করে জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
সর্বস্বত্ত্ব © দৈনিক শতকন্ঠ - ২০২১ কর্তৃক সংরক্ষিত।
Theme Customized By BreakingNews